প্রথমবারের মতো নারী এশিয়ান কাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিজেই একটি মাইলফলক। এই আসর পেরিয়ে যদি একদিন অলিম্পিক কিংবা বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের মেয়েদের দেখা যায়, সেটি হবে দেশের ফুটবলের ইতিহাসে অভাবনীয় অধ্যায়। বাস্তবতার মাটিতে পা রেখেই সেই স্বপ্ন দেখছেন বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের কোচ পিটার জেমস বাটলার।

অস্ট্রেলিয়ায় আগামী ৩ মার্চ শুরু হচ্ছে মেয়েদের এশিয়ান ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর। ‘বি’ গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী উত্তর কোরিয়া, চীন ও উজবেকিস্তান। প্রথমবার এই মঞ্চে পা রাখলেও বাংলাদেশকে ঘিরে প্রত্যাশা শুধুই অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ নয়।

এই আসরে গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারলে আটটি দল সরাসরি ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকস-এ খেলার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে সেরা ছয় দল টিকিট কাটবে এ বছরের জুন-জুলাইয়ে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিতব্য নারী ফুটবল বিশ্বকাপের। স্বাভাবিকভাবেই এশিয়ান কাপ হয়ে উঠেছে ভবিষ্যতের দরজা।

এই টুর্নামেন্ট সামনে রেখে নারী ফুটবলের অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নিয়ে ফিফা-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ভাবনার কথা বলেছেন বাটলার। তিন বছর ধরে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সঙ্গে কাজ করা এই ইংলিশ কোচের লক্ষ্য একটাই—শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো একটি দল।

বাটলারের চোখে এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনই বড় অর্জন।

“এটি খুব তরুণ একটি দল। প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড়ের বয়স ২০ বছরের নিচে। একই সময়ে আমাদের অনূর্ধ্ব-২০ দলও এশিয়ান কাপে খেলছে। এসব ইঙ্গিত দিচ্ছে, সামনে বড় কিছু ঘটতে পারে।”

২০২২ সালে নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর ২০২৪ সালেও সেই শিরোপা ধরে রাখে বাংলাদেশ। তবে এর মাঝেই ১৮ খেলোয়াড়ের বিদ্রোহ, অভিজ্ঞদের বাদ পড়া—সব মিলিয়ে দল গেছে বড় রদবদলের মধ্য দিয়ে। সাবিনা খাতুন, মাসুরা পারভীন, কৃষ্ণা রানী সরকার, নিলুফা ইয়াসমিন নীলার মতো পরিচিত মুখরা এখন আর বাটলারের পরিকল্পনায় নেই।

একসময় ওয়েস্টহ্যাম ইউনাইটেড-এ খেলা বাটলার সামনে এগোতে চান আফঈদা, স্বপ্নাদের মতো তরুণদের নিয়েই। তবে বড় স্বপ্নের কথা বলে এখনই দলকে মানসিক চাপে ফেলতে নারাজ তিনি।

“আমরা এই টুর্নামেন্ট জেতার প্রত্যাশা নিয়ে যাচ্ছি না। মূল লক্ষ্য এমন একটি ভিত্তি তৈরি করা, যেন বাংলাদেশ নিয়মিত এই মঞ্চে খেলতে পারে।”

বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার শুরুর সময়কার বাস্তবতাও তুলে ধরেছেন তিনি। বাফুফেকে আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন, কিছু সিদ্ধান্ত জনপ্রিয় নাও হতে পারে।

“আমি মানুষকে খুশি করতে আসিনি। স্কোয়াডে এমন খেলোয়াড় ছিল, যারা সেখানে থাকার যোগ্য ছিল না। কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, খেলোয়াড়রাও সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।”

বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে অবকাঠামো, ডায়েট ও পুষ্টির বিষয়গুলো।

“ভালো প্রশিক্ষণ মাঠের অভাব রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে আমাকে আরও নমনীয় হতে হয়েছে। এখান থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা পেয়েছি, তা হলো মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।”

তবে এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনেই থেমে থাকতে চান না বাটলার। তার নজর ভবিষ্যতের দিকে।

“আমরা কেবল শুরু করেছি। বড় চ্যালেঞ্জ এখনও সামনে। আমার মনোযোগ ট্রফির চেয়ে বয়সভিত্তিক দল ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের দিকে।”

বাস্তবতা হলো, উত্তর কোরিয়া ও চীন বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। উত্তর কোরিয়া এই আসরের রেকর্ড নয়বারের চ্যাম্পিয়ন, চীন তিনবার। তুলনামূলকভাবে উজবেকিস্তানই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে লড়াইয়ের প্রতিপক্ষ।

“আমরা সুশৃঙ্খল ও লড়াকু ফুটবল খেলতে চাই। তবে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা আমাদের জন্য পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।”

বতসোয়ানা ও লাইবেরিয়ার মতো দল ছাড়াও নানা ক্লাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে বাটলারের। ২০২৩ সালে বাফুফের এলিট একাডেমির দায়িত্ব নেওয়ার পরই নারী দলের কোচ হন তিনি। এখন তার একমাত্র লক্ষ্য—এই এশিয়ান কাপে বাংলাদেশের লড়াইটা যেন সাহসী ও পরিচ্ছন্ন হয়।

“ফুটবল শুধু সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও নয়। প্রকৃত উন্নয়ন আসে মাঠে, কোচিংয়ে এবং জ্ঞান ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে। নারী ফুটবল দ্রুত এগোচ্ছে। তাল মিলিয়ে না চললে পিছিয়ে পড়তে হবে।”

Previous article২৬ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াড নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছেন বাটলার, ফিরলেন প্রবাসী আনিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here