বাংলাদেশের তরুণ ফুটবলারদের পেশাদার ফুটবল অঙ্গনে প্রবেশের প্রথম ধাপ হচ্ছে পাইওনিয়ার ফুটবল লিগ। ২ বছরের বিরতি কাটিয়ে এই মৌসুমে আবারো মাঠে গড়াচ্ছে তরুন ফুটবলারদের উঠে আসার অন্যতম প্রধান উৎস পাইওনিয়ার লিগ। করোনার কারণে এবারের লিগে শুধুমাত্র ঢাকা জেলার দলগুলো অংশ নেবে। তবে প্রতিবারই পাইওনিয়ার লিগ শুরু হলেই বয়স চুরির হিড়িক লাগে। বাফুফের ডাক্তার বা কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে খালি চোখে এতদিন বয়স পরীক্ষা করা হতো। এই পদ্ধতিতে খুব একটা থামানো যায়নি বয়স চুরি। তাই এবারের পাইওনিয়ার লিগে বয়স চুরি ঠেকাতে কঠোর হচ্ছে বাফুফে।

এবার পাইওনিয়ার লিগে অংশ নেয়া ফুটবলারদের হাসপাতালে গিয়ে বয়স পরীক্ষা করাতে হবে। মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে যে ৬১টি দল এবারের লিগে খেলবে তারা তাদের নিজ উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে গিয়ে ফুটবলারদের তিনটি টেস্ট করাতে হবে; যাতে প্রমাণিত হয় ফুটবলারদের বয়স অনূর্ধ্ব-১৫ এর মধ্যে। ফুটবলারদের বয়স যাচাই সংক্রান্ত মেডিকেল টেস্টসমূহ সম্পন্ন করতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একটি চুক্তি করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। মেডিকেল টেস্টে যাদের বয়স পনেরোর নিচে প্রমাণিত হবে তাদের টেস্টজনিত সকল খরচ বহন করবে বাফুফে।২২ জানুয়ারি থেকে মেডিকেল টেস্ট শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বাফুফের পাইওনিয়ার লিগ কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান মহিদুর রহমান মিরাজ জানান, “পাইওনিয়ার লিগে অংশ নেওয়া ফুটবলারদের বয়স শনাক্তে ৩টা টেস্ট করা হবে, যাতে আমরা তাদের বয়স পুঙ্খানপুঙ্খভাবে নির্ধারণ করতে পারি। তারপরও যদি খেলা চলাকালীন কোনো ফুটবলারের বয়স আমাদের চোখে দৃষ্টিকটু লাগে সে বিষয়েও আমরা পরবর্তীতে কি পদক্ষেপ নেবো সেগুলো আলোচনা করে রেখেছি।”

বয়স চুরি ঠেকাতে বাফুফের গৃহীত এমন পদক্ষেপে সাধুবাদ জানিয়েছে এবারের পাইওনিয়ার লিগে অংশ নিতে যাওয়া ক্লাবগুলোও। প্রথমবারের মতো পাইওনিয়ার লিগে অংশ নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা নবাগত দল স্কাইলার্ক ফুটবল ক্লাবের ম্যানেজার সোহেব ইবনে সামস বাফুফের গৃহীত পদক্ষেপকে প্রশংসা করার পাশাপাশি সকল কার্যক্রম পরিচ্ছন্নভাবে সম্পাদন করার প্রতি জোর দিয়ে অফসাইডকে জানান, “আজকাল কাগজপত্র জালিয়াতি করা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে, তাই আসন্ন পাইওনিয়ার ফুটবল লিগে বয়স নির্ণয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নেয়া মেডিকেলের নতুন পদ্ধতি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে বিষয়টি যেন সঠিকভাবে পরিচালিত হয় এবং কেউ যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজ ক্লাবের জন্য সুবিধা আদায় করে না নিতে পারে সেদিকে নজর দেয়ার অনুরোধ থাকবে বাফুফে’র কাছে। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে অংশগ্রহণকারী অনেক দলের পেছনেই বিভিন্ন বড় কর্তাদের হাত থাকে, তাই মেডিকেলে সততা ধরে রাখতে কঠোর হওয়া ছাড়া উপায় নেই।”

প্রথমবারের মতো পাইওনিয়ার লিগ খেলার অপেক্ষায় থাকা আরেক নবাগত ক্লাব এফসি ইউনাইটেড ফেনীর সভাপতি সৈয়দ আবদুল্লা হারুন রানাও বয়স চুরি ঠেকাতে বাফুফের গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। সৈয়দ আবদুল্লা হারুন রানা অফসাইডকে জানান, “এতদিন পরে হলেও বয়স চুরি ঠেকাতে বাফুফের গৃহীত পদক্ষেপের সাধুবাদ জানাই, এতে এফসি ইউনাইটেড ফেনীর পূর্ন সমর্থন রয়েছে। আমি মনে করি বয়স চুরি ঠেকাতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জনাব আবু নাঈম সোহাগ এবং পাইওনিয়ার লীগ কমিটির চেয়ারম্যান জনাব ইমরুল হাসান এর যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত এবং পদক্ষেপ যথার্থ।”

বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে বয়স চুরি বা কম দেখিয়ে বেশি বয়সের ফুটবলার খেলানো একেবারে নিয়মিত দৃশ্যই বলা চলে। এই পদ্ধতিতে স্বল্প সময়ে সাফল্য পেলেও এর প্রভাব পড়ে পরবর্তী পর্যায়ে। জাতীয় পরিচয়পত্র না হওয়া ফুটবলারদের বয়স কমিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করে দিয়ে বয়সভিত্তিক দলগুলোতে খেলালেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ভবিষ্যতে। তাইতো বয়সভিত্তিক পর্যায়ে দুর্দান্ত খেলা ফুটবলাররা জাতীয় দলে এসে ব্যার্থ হচ্ছেন নিয়মিতই। কেননা বয়স কমিয়ে ২০ বছরের একজন ফুটবলার যদি ১৫ বছর বয়সী ফুটবলারদের সাথে খেলে, স্বাভাবিকভাবেই সে বাকিদের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে থাকবে। কিন্তু পরবর্তীতে তার সমবয়সীদের সাথে খেলতে গেলেই তার দুর্বলতা ফুটে ওঠবে। এছাড়াও ভবিষ্যতে কাগজপত্রজনিত সমস্যা তো হবেই। সব মিলিয়ে ‘বয়স চুরি’ দেশের ফুটবলের জন্য একটি অভিশাপই বটে। তবে এই অভিশাপ থেকে বেরিয়ে আসতে পাইওনিয়ার লিগ কমিটির কঠোর অবস্থান নিশ্চিতভাবেই দেশের ফুটবলের ভবিষ্যতকে অন্ধকারমুক্ত করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here